ম্যাচের ৭৪তম মিনিটে যখন মোহামেদ সালাহকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সংকেত দেওয়া হলো, গোটা অ্যানফিল্ড তখন মুখরিত হয়ে উঠল গগনবিদারী করতালিতে। মিশরীয় এই কিংবদন্তি হাত নেড়ে সমর্থকদের রাজকীয় অভিবাদনের জবাব দিলেন। একে একে তাঁকে পরম মমতায় আলিঙ্গনে বাঁধলেন সতীর্থরা। এরপর চেনা সবুজ ঘাসে শেষবারের মতো সিজদাহ দিয়ে মাঠ ছাড়লেন তিনি—লিভারপুলের জার্সিতে চিরতরের জন্য!
প্রিমিয়ার লিগের শেষ দিনে রোববার ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হলো সালাহর গৌরবময় ৯ বছরের লিভারপুল অধ্যায়। আর এই বিদায়ের বেলাতেও একটি মস্ত বড় রেকর্ড নিজের সঙ্গী করলেন তিনি। অলরেডদের সাবেক কিংবদন্তি স্টিভেন জেরার্ডকে (৯২) ছাড়িয়ে লিভারপুলের ইতিহাসে প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের (৯৩) অনন্য রেকর্ড এখন সালাহর দখলে।
অবশ্য সালাহর এই বিদায়ী ম্যাচটি জয়ে রাঙাতে পারেনি তাঁর সতীর্থরা। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। তবে ঘরের মাঠে এই এক পয়েন্ট পাওয়ার সুবাদেই আগামী মরসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছে লিভারপুল।
অ্যানফিল্ডের এই ম্যাচে গোলও পেতে পারতেন সালাহ। ১৯তম মিনিটে তাঁর দুর্দান্ত একটি ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর ৫৮তম মিনিটে কার্টিস জোন্সের গোলে এগিয়ে যায় লিভারপুল। এই গোলের উৎস ছিলেন সালাহ নিজেই, যার মাধ্যমে জেরার্ডকে টপকে অ্যাসিস্টের নতুন উচ্চতায় পা রাখেন তিনি। তবে লিভারপুলের এই আনন্দ স্থায়ী হয়েছে মাত্র ৫ মিনিট। ৬৩তম মিনিটে গোলটি শোধ করে দেয় ব্রেন্টফোর্ড। এর মিনিট দশেক পরেই দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাঠ ছাড়েন সালাহ।
গত বছর ক্লাবের সঙ্গে দুই বছরের চুক্তি করলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত মার্চের শেষ দিকে এই তারকা ফরোয়ার্ড ঘোষণা দিয়েছিলেন—চলতি মরসুম শেষেই লিভারপুলে তাঁর মহাকাব্যিক যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে।
২০১৭ সালে তখনকার ক্লাব রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে সালাহকে দলে ভিড়িয়েছিল লিভারপুল। অ্যানফিল্ডের প্রথম মিশরীয় এই ফুটবলার খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সমর্থকদের চোখের মণি। সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলেন তিনি। এই জার্মান কোচের অধীনেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও প্রিমিয়ার লিগসহ সব বড় শিরোপার স্বাদ পেয়েছে ক্লাবটি, আর প্রতিটি সাফল্যে অবিকল্প ভূমিকা রেখেছিলেন সালাহ। বর্তমান কোচ আর্না স্লটের অভিষেক মরসুমে লিভারপুল যে লিগ শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছিল, সেখানেও আসরের সর্বোচ্চ ২৯টি গোল করে বড় অবদান রেখেছিলেন এই মিশরীয় রাজা।
তবে ক্লপ যুগের সেই চেনা ধার এবার সালাহর খেলায় খুব একটা দেখা যায়নি। নতুন কোচ স্লট তাঁকে বেশ কিছু ম্যাচে শুরুর একাদশে রাখেননি। ফলে কোচের সাথে তাঁর মনোমালিন্য এবং ক্লাবের সাথে দূরত্ব নিয়ে ফুটবল পাড়ায় গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। সালাহ নিজে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁকে দলের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে। একপর্যায়ে তো এক ম্যাচের স্কোয়াড থেকেই সালাহকে বাদ দিয়ে বসেন স্লট।
পরবর্তীতে কোচের সাথে সালাহর বরফ কিছুটা গললেও সম্পর্ক আর পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। গত সপ্তাহে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ৪-২ গোলে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টিকিট পাওয়া যখন শঙ্কায় পড়েছিল, সালাহ সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ সরাসরি দলের খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দলের এই অধারাবাহিকতার সমালোচনা করে সাবেক কোচ ক্লপের সেই চেনা আক্রমণাত্মক কৌশলে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্য নিয়ে ব্রেন্টফোর্ড ম্যাচের আগে কোচ স্লটকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, “মো (সালাহ) ও আমার লক্ষ্য একই, আমরা এই ক্লাবের জন্য সবসময় সেরাটাই চাই…।” তবে শেষ ম্যাচে এই তারকাকে খেলানো হবে কি না, সেদিন তা নিশ্চিত করতে চাননি কোচ।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিদায়ী ম্যাচে শুরুর একাদশেই রাখা হয় সালাহকে। আর উপলক্ষটাও তিনি রাঙালেন রেকর্ড বুক ওলটপালট করে। ম্যাচ শেষেও তাঁর রাজকীয় বিদায়ের জন্য বিশেষ আয়োজন রেখেছিল লিভারপুল কর্তৃপক্ষ।
লিভারপুলের হয়ে নিজের শেষ মরসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২৭ ম্যাচে সালাহর গোল ও অ্যাসিস্ট সমান ৭টি করে। আর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪১ ম্যাচে তাঁর গোল ১২টি এবং অ্যাসিস্ট ১০টি। ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তৃতীয় স্থানে থেকে বিদায় নিলেন সালাহ। লিভারপুলের জার্সিতে ৪৪২ ম্যাচে তাঁর গোল ২৫৭টি, আর অ্যাসিস্ট ১২৩টি। দলগত অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বহু পুরস্কারে নিজের ক্যাবিনেট ভরিয়েছেন অ্যানফিল্ডের এই ‘ইজিপশিয়ান কিং’।