মহানাটকীয় এক ম্যাচে শেষ বলের ফয়সালায় সিলেট টাইটান্সের জয়ের নায়ক হয়ে উঠলেন ক্রিস ওকস। আর হৃদয়ভাঙা পরাজয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো রংপুর রাইডার্সকে।
শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি ছিল জটিল। হাতে সুযোগ ছিল দুটি রান নেওয়ার, কিন্তু সিঙ্গেলেই থামলেন ক্রিস ওকস। নিজেই বেছে নিলেন কঠিন পথ—শেষ বলে ছক্কা মারার চ্যালেঞ্জ। পুরো স্টেডিয়াম তখন নিঃশ্বাস চেপে তাকিয়ে। ফাহিম আশরাফ অফ স্টাম্পের বাইরে বল করতেই ব্যাট চালালেন ওকস। শট খেলেই বুঝে যান কাজটা হয়ে গেছে। হাত তুলে ইশারা করলেন, বল উড়তে উড়তে এক্সট্রা কাভার পেরিয়ে গিয়ে পড়ল গ্যালারিতে। মুহূর্তেই বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল গ্যালারি, উল্লাসে মাতল সিলেট শিবির।
বিপিএলের ১২ মৌসুমে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ হয়েছে। তবে এই ম্যাচটি জায়গা করে নিল বিশেষ তালিকায়। রোমাঞ্চে ঠাসা লড়াইয়ে শেষ বলের ছক্কায় নায়ক ক্রিস ওকস।
মাত্র দুদিন আগে দলে যোগ দিয়ে মৌসুমে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই ওকস দেখালেন নিজের গুরুত্ব। বল হাতে ছিলেন নিয়ন্ত্রিত ও ধারালো, আর ব্যাট হাতে শেষ মুহূর্তে ভাগ্য গড়ে দিলেন সিলেটের। তিন উইকেটের নাটকীয় জয়ে ফাইনালের লড়াইয়ে টিকে রইল সিলেট টাইটান্স। অন্যদিকে, গতবারের মতো এবারও এলিমিনেটর থেকেই বিদায় নিতে হলো শিরোপার অন্যতম দাবিদার রংপুর রাইডার্সকে।
বিপিএলের ইতিহাসে শেষ ওভারে চার ছক্কা মেরে জয় এসেছে, শেষ ওভারে ২৬ রান দিয়ে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও আছে। কিন্তু এক বলে ছয় রান দরকার, সেখান থেকে জয়ের নজির—এটাই প্রথম।
মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার আগে ব্যাট করে রংপুর ২০ ওভারে তোলে ১১১ রান। তিন ম্যাচ পর একাদশে ফিরে দুর্দান্ত বোলিং করেন সৈয়দ খালেদ আহমেদ, নেন চার উইকেট। দুটি করে উইকেট পান ক্রিস ওকস ও নাসুম আহমেদ।
উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ ছিল না। তবু ম্যাচ যে এতটা রোমাঞ্চ ছড়াবে, বিরতিতে খুব কম মানুষই তা ভেবেছিলেন। বাউন্স ও মুভমেন্ট ছিল শুরু থেকেই, সময়ের সঙ্গে উইকেট আরও মন্থর হয়ে পড়ে। বল থেমে আসছিল ব্যাটে।
রংপুরের ইনিংস শুরুতেই ধাক্কা খায়। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারে বাইরের বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন তাওহিদ হৃদয়। পরের ওভারে বাজে শটে ওকসের বলে ফিরেন দাভিদ মালান। অধিনায়ক লিটন দাসও দ্রুত বিদায় নেন। পুরো টুর্নামেন্টে ১১ ম্যাচ খেলেও কোনো ফিফটির দেখা পাননি তিনি।
পাওয়ার প্লে শেষ হতেই কাইল মেয়ার্সও ফিরলে ৩০ রানে চার উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে রংপুর। সেখান থেকে খুশদিল শাহ ও মাহমুদউল্লাহ চেষ্টা করেন ঘুরে দাঁড়ানোর। দুজনের আক্রমণে কিছুটা আশার আলো দেখা দিলেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি কেউই। মাহমুদউল্লাহ ২৬ বলে ৩৩ রান করে ফিরলে রংপুরের লড়াই কার্যত থেমে যায়। শেষ দিকে সোহান কিছুটা সময় কাটালেও সংগ্রহ বড় হয়নি।
এই রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় সিলেট। মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম ওভারেই তুলে নেন তৌফিক খান তুষারের উইকেট। এরপর পারভেজ হোসেন ইমন ও আরিফুল ইসলাম কিছুটা এগোলেও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। আট ওভারে সিলেটের স্কোর দাঁড়ায় ৪৪/৪।
সেখান থেকে ম্যাচে প্রাণ ফেরান স্যাম বিলিংস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। খুব সাবলীল না হলেও ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করেন দুজন। ৫৪ বলে তাদের ৫০ রানের জুটি ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মিরাজ স্টাম্পড হলে আবার চাপে পড়ে সিলেট।
পরিস্থিতি বুঝে খেলেন বিলিংস। ৩২ বলেও কোনো বাউন্ডারি ছিল না, পরে একটি ছক্কা মারলেও শেষ পর্যন্ত ফিরতে হয় ২৯ রানে। শেষ দুই ওভারে প্রয়োজন পড়ে ১৫ রান, শেষ ওভারে ৯।
শেষ ওভারে নাটক আরও ঘনীভূত হয়। মইন আলির বিদায়ের পর পঞ্চম বলে নেওয়া সেই এক রানই রেখে দেয় শেষ বলের সমীকরণ। আর শেষ বলেই ওকসের ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে সেই স্বপ্নের ছক্কা।
মাঠে ছুটে আসেন অধিনায়ক মিরাজ, সতীর্থরা মেতে ওঠেন বাঁধনহারা উদযাপনে। বিপরীতে রংপুর শিবিরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা—কেউ হতভম্ব, কেউ মাটিতে বসে পড়েন হতাশায়।
এই জয়ে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে খেলবে সিলেট টাইটান্স। ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন দুর্দান্ত বোলিং করা সৈয়দ খালেদ আহমেদ।