তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি আর বোলারদের বিধ্বংসী পারফরম্যান্সে চট্টগ্রামকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে বিপিএলের শিরোপা জিতে নিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
গ্যালারির লড়াইয়ে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল রাজশাহীর দাপট। হাজার হাজার কমলা পতাকা আর সমর্থকদের গর্জনে মিরপুর যেন পরিণত হয়েছিল রাজশাহীর ঘরের মাঠে। তবে শুধু গ্যালারির জয়েই ম্যাচ জেতা যায় না—লড়াইটা যে ২২ গজে। সেখানেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে রাজশাহী। তানজিদের রেকর্ডগড়া সেঞ্চুরির পর বোলারদের দাপটে চট্টগ্রামের আর দাঁড়ানোর সুযোগই থাকেনি।
বিপিএলের দ্বাদশ আসরের ফাইনালে একতরফা লড়াইয়ে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। শুক্রবার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রাজশাহীর জয়ের ভিত গড়ে দেন তানজিদ হাসান।
আগের ১২ ম্যাচে মাত্র একটি ফিফটি করেছিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। অথচ ফাইনালের মঞ্চেই খেলেন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস। ৭টি ছক্কা ও দৃষ্টিনন্দন শটে সাজানো ৬২ বলে ১০০ রান করে রাজশাহীর ইনিংসকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি।
এটি ছিল তানজিদের তৃতীয় বিপিএল সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিপিএলে তিনটি শতকের কীর্তি গড়লেন তিনি। একই সঙ্গে বিপিএল ফাইনালে তিন অঙ্ক ছোঁয়া প্রথম ব্যাটসম্যানও হলেন তানজিদ।
তার সেঞ্চুরির পরও বিশাল স্কোর গড়তে পারেনি রাজশাহী। নির্ধারিত ২০ ওভারে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৭৪ রান। কিন্তু এই রানই চট্টগ্রামের জন্য হয়ে ওঠে পাহাড়সম। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১১১ রানেই গুটিয়ে যায় রয়্যালস।
বোলিংয়ে রাজশাহীর হয়ে দুর্দান্ত ছিলেন বিনুরা ফার্নান্দো। পুরো আসরজুড়ে ভালো পারফরম্যান্সের পর ফাইনালে এসে নিজেকেও ছাড়িয়ে যান এই পেসার। মাত্র ৯ রান খরচায় তুলে নেন ৪ উইকেট—বিপিএল ফাইনালের অন্যতম সেরা বোলিং পারফরম্যান্স।
ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন হাসান মুরাদও। তিন উইকেট নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যাটিং ধস আরও ত্বরান্বিত করেন তিনি।
বিপিএলে অভিষেকেই শিরোপা জিতল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। যদিও রাজশাহী নামের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির এটি দ্বিতীয় শিরোপা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের ফ্র্যাঞ্চাইজির শিরোপা-স্বপ্ন এবারও অপূর্ণই রয়ে গেল।
টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগের দিন মালিকানায় পরিবর্তনের পর বিসিবির তত্ত্বাবধানে খেলেই ফাইনালে ওঠা চট্টগ্রামের জন্য কম কৃতিত্বের নয়। ফাইনালের আগে রাজশাহীর সঙ্গে তিন ম্যাচের দুটিতেই জিতেছিল তারা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতেই বাজিমাত করল রাজশাহী।
চট্টগ্রামের মূল শক্তি ছিল বোলিং। কিন্তু আসরের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই সেই বোলিং আক্রমণ যেন ধার হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে তানজিদের সামনে বারবার ভুল লাইনে বল করে সহজ সুযোগ করে দেন বোলাররা।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে খুব আক্রমণাত্মক শুরু না করলেও পাওয়ার প্লে শেষে রাজশাহী ছিল চাপে নয়। প্রথম ছয় ওভারে বিনা উইকেটে ৪০ রান তোলে তারা। তবে তানজিদের ব্যাটে তখনই ইঙ্গিত মিলছিল বড় কিছুর।
পাওয়ার প্লে শেষ হতেই ভয়ংকর রূপ নেন তানজিদ। শেখ মেহেদি হাসান ও মির্জা বেগকে একের পর এক ছক্কায় কোণঠাসা করে দেন। মাত্র ২৯ বলেই ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। ১০ ওভার শেষে রাজশাহীর স্কোর দাঁড়ায় ৮২, যার মধ্যে তানজিদেরই ছিল ৫১ রান।
পরের ওভারেই ভাঙে উদ্বোধনী জুটি। সাহিবজাদা ফারহান ৩০ বলে ৩০ রান করে আউট হন। তবে তানজিদের ছুটে চলা থামেনি।
৫৪ রানে স্কয়ার লেগে সহজ ক্যাচ ফেলে তাকে দ্বিতীয় জীবন দেন মুকিদুল ইসলাম। এরপর কেন উইলিয়ামসনের সঙ্গে গড়ে তোলেন ৪৭ রানের জুটি। ১৫ বলে ২৪ রান করা উইলিয়ামসন একটি দৃষ্টিনন্দন ছক্কার পরের বলেই আউট হয়ে যান।
৮৮ রানে আবারও জীবন পান তানজিদ—এবার ক্যাচ ছাড়েন আসিফ আলি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই তিন অঙ্কের পথে এগিয়ে যান তিনি। ৯১ থেকে শেখ মেহেদিকে ছক্কা মেরে পৌঁছে যান শতকের কাছাকাছি। পরের ওভারেই ধরা দেয় কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক।
তানজিদ আউট হন শতকের পরের বলেই। শেষ দিকে খুব বেশি রান যোগ করতে পারেনি রাজশাহী। শেষ বলে নাজমুল হোসেন শান্তকে আউট করে বিপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ ২৬ উইকেটের নতুন রেকর্ড গড়েন শরিফুল ইসলাম, ভেঙে দেন তাসকিন আহমেদের আগের রেকর্ড।
লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় চট্টগ্রাম। তৃতীয় ওভারেই বিদায় নেন নাঈম শেখ ও মাহমুদুল হাসান জয়। ওপেনার মির্জা বেগ কিছুটা লড়াই করে ৩৬ বলে ৩৯ রান করলেও বাকিরা কেউই দাঁড়াতে পারেননি।
মিডল অর্ডারে আসিফ আলি করেন ২১ রান। শেষের আগেই কার্যত ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যায় চট্টগ্রামের। ১৩ বল হাতে থাকতেই ১১১ রানে অলআউট হয় তারা। এরপরই রাজশাহীর ক্রিকেটার ও স্টাফরা মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উদ্যাপনে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: ২০ ওভারে ১৭৪/৪
- চট্টগ্রাম রয়্যালস: ১৭.৫ ওভারে ১১১
ফল: রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ৬৩ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: তানজিদ হাসান