জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল এহসানের দীর্ঘ বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) গত নির্বাচনের অন্ধকার সব অধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত নির্বাচনটি ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত কারসাজি। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং বিদায়ী বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কীভাবে নির্বাচনকে কলুষিত করা হয়েছে, তার বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে এখানে।
নিচে তদন্ত কমিটির প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. কাউন্সিলর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ও জালিয়াতি
কমিটি জানিয়েছে, বিসিবি এবং এনএসসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।
- সময়সীমা বৃদ্ধি: নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাউন্সিলর করার সুযোগ দিতে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ফরম জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হয়েছিল।
- ডিসিদের প্রভাবিত করা: তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার এপিএস সাইফুল ইসলাম বগুড়া ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রভাবিত করেছিলেন, যা সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
- অ্যাডহক কমিটির অপব্যবহার: জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিদের নাম কাউন্সিলর হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
২. সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের একক আধিপত্য
তদন্তে দেখা গেছে, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে এবং তার এপিএসের মাধ্যমে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
- তিনি তার পছন্দের প্রার্থীদের জেতাতে জেলা ও বিভাগীয় সভাপতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
- চট্টগ্রাম ও রংপুরের মতো বিভাগগুলোতে অ্যাডহক কমিটির সদস্য সংখ্যা বিধি বহির্ভূতভাবে বাড়িয়ে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের ভোটার করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
৩. ই-ভোটিং ও ‘শেরাটন’ রহস্য
নির্বাচনের স্বচ্ছতা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ে।
- গোপনীয়তা লঙ্ঘন: হোটেল শেরাটনে ভোটারদের এক জায়গায় জড়ো করে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
- পদ্ধতিগত ত্রুটি: ই-ভোটিং সিস্টেমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে ফলাফল আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৪. আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও ফাহিম ইকবালের নিয়োগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে বিসিবি পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের ঢাকা জেলা ও ঢাকা বিভাগের অ্যাডহক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল একটি ‘গুরুতর ক্ষমতার অপব্যবহার’। এছাড়া বুলবুল বিসিবি সভাপতি হিসেবে একক সিদ্ধান্তে ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর মনোনীত করেছিলেন, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না।
৫. ফারুক আহমেদের মনোনয়নে প্রশ্ন
বিসিবির বর্তমান পরিচালক ফারুক আহমেদের মনোনয়ন গ্রহণ নিয়েও অসংগতি পেয়েছে কমিটি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর তার মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়া হয়েছিল, যা তাকে ‘বেআইনি সুবিধা’ দেওয়ার নামান্তর বলে মনে করে কমিটি।
সংস্কারের সুপারিশমালা
তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে কিছু জরুরি সুপারিশ করেছে:
- সংবিধান সংশোধন: বিসিবির নির্বাহী ও নির্বাচনী ক্ষমতা আলাদা করতে হবে। একটি স্বাধীন ‘গভর্ন্যান্স ও এথিকস কমিটি’ গঠন করতে হবে।
- স্থায়ী নির্বাচন কমিশন: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা।
- ভোটার তালিকা: নির্বাচনের অন্তত ৬০ দিন আগে ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং আপত্তির সুযোগ রাখা।
- ই-ভোটিং নিরীক্ষা: যে কোনো অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থার আগে তৃতীয় পক্ষ বা থার্ড পার্টি দিয়ে সিকিউরিটি অডিট করানো বাধ্যতামূলক করা।
এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই বিসিবির বর্তমান বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে এনএসসি। ২০১৮ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আইসিসিকেও অবহিত করা হয়েছে। আগামী ৩ মাসের মধ্যে এই কমিটি একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের আয়োজন করবে।