চা বিরতি শেষ হতে তখনও মিনিট পাঁচেক বাকি। দুই দলের ক্রিকেটারদের সবাই আরাম করে বসে আছেন ড্রেসিংরুমেই। কিন্তু একজন তখন দাঁড়িয়ে বাউন্ডারি লাইনের ঠিক সামনে, মাঠে নামতে তাঁর যেন ভীষণ তাড়া। তিনি মুশফিকুর রহিম—ব্যাট করতে যেন আর তর সইছিল না তাঁর।
সইবেই বা কী করে, এমনিতেই ক্রিকেট আর জীবনকে একসূত্রে গেঁথে ফেলা মুশফিক যে তখন অপরাজিত নব্বই রানে। দুই সেশনের মাঝের ওই ১৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত চা বিরতিটাই তাই তাঁর কাছে অনন্তকাল মনে হচ্ছিল। মাঠে ফিরে বাকি ১০ রানের জন্য তাঁর অপেক্ষা ফুরাতে লেগেছে আরও ২৩ বল।
মোহাম্মদ আব্বাসের বলে চার মেরে অপেক্ষাটা যখন শেষ হলো, মুশফিক তখন আবেগে পুরোপুরি ভেসে গেলেন। কে জানে, টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৪তম সেঞ্চুরি করার পরও হয়তো প্রথম সেঞ্চুরির মতোই আনন্দ ছুঁয়ে গিয়েছিল তাঁকে। বলটা বাউন্ডারির সীমানা পার হবে বুঝতে পেরেই হাত দুটো উঁচিয়ে ধরেন। ক্রিজের মাঝখানে গিয়ে তীব্র আবেগে ফেলে দেন হাতের ব্যাটও। দু হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরেন নন-স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা সতীর্থ তাইজুল ইসলামকে—আর তখন ড্রেসিংরুম থেকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন বাকিরা।
গতকাল দিনের শেষ বলে মুমিনুল হক আউট হওয়ায় আজ সকালে নাজমুল হোসেনকে নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করতে হয় মুশফিককে। তাঁরা যখন ব্যাটিংয়ে নামেন, পুরো আকাশ তখন মেঘে ঢাকা, কন্ডিশনও বোলারদের অনুকূলে। পরে অবশ্য রোদ উঠেছে, আর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার মাঝে একে একে নাজমুল হোসেন, লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজও সাজঘরে ফিরে গেছেন।
তবে একপ্রান্ত আগলে অবিচল থেকে গেছেন শুধু মুশফিকুর রহিম। শান্ত, ধীরস্থির আর প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য এক মহা বিরক্তির কারণ হয়ে। নাজমুলকে নিয়ে সকালের শুরুর কঠিন সময়টা পার করার পর লিটনের সঙ্গে গড়েন ১৮৬ বলে ১২৩ রানের এক দারুণ জুটি। আর তাতেই বাংলাদেশের লিড তিন শ ছাড়িয়ে যায়। লিটন আউট হওয়ার পর ইনিংসটাকে টেনে নেন মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে।
পরবর্তীতে তাইজুলের সঙ্গে মুশফিকের অবিচ্ছিন্ন জুটিও পঞ্চাশের ঘর পেরিয়ে গেছে, যার প্রতিটি রানই পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে আরও দূরে ছিটকে দিচ্ছিল।
এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে মুমিনুল হককে (১৩) টপকে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির (১৪) রেকর্ডটি এখন নিজের করে নিলেন মুশফিক। তিন সংস্করণ মিলিয়ে অবশ্য তাঁর চেয়ে দুটি সেঞ্চুরি বেশি আছে তামিম ইকবালের। তবে এসব রেকর্ড ভাঙা–গড়ার খেলা ছাপিয়ে মুশফিক এখন নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। টেস্ট ক্রিকেটে তিনি যে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আসল মেরুদণ্ড, আজ সিলেটে তা আরও একবার প্রমাণ করলেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল।