অসাধারণ এক কীর্তির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত পারলেন না লিটন কুমার দাস। তার খেলা সেই শটটিকে কী বলা যায়—আপার কাট নাকি স্ল্যাশ? এর চেয়ে বরং বলা ভালো ক্রিকেটীয় ‘আত্মহত্যা’। লিটন দাসের কাছে এই শটের নাম এখন শুধুই ‘হতাশা’। প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ফিফটি করা ব্যাটসম্যানের দিকে আঙুল তোলা কঠিন, তবে আক্ষেপ তো করাই যায়। দারুণ এক বিশ্বরেকর্ডের হাতছানি ছিল বাংলাদেশের এই কিপার-ব্যাটারের সামনে, যা তিনি স্রেফ বিলিয়ে দিয়ে এলেন ওই এক শটে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনে হাসান আলির বলে ওই শট খেলতে গিয়েই লিটনের ইনিংস থামে ৬৯ রানে। অথচ প্রথম ইনিংসে তিনি খেলেছিলেন ১২৬ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস। ফলে বাংলাদেশের প্রথম এবং টেস্ট ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে এক ম্যাচে জোড়া শতরানের এক বিরল কীর্তির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা হলো না।
কিপার-ব্যাটার হিসেবে টেস্টে জোড়া শতরানের প্রথম কীর্তিটি গড়েছিলেন জিম্বাবুয়ের অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারারে টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১৪২ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। ওই ম্যাচে ফ্লাওয়ারের করা মোট ৩৪১ রান এখনো উইকেটকিপার হিসেবে এক টেস্টে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড। এর প্রায় ২৬ বছর পর ফ্লাওয়ারের সঙ্গী হন ভারতের রিশাভ পান্ত। গত বছর ইংল্যান্ডের হেডিংলিতে তিনি ১৩৪ ও ১১৮ রানের দুটি ইনিংস খেলেছিলেন।
আজকের ইনিংসে অবশ্য দুইবার জীবন পেয়েছিলেন লিটন। ৩৮ রানে তাকে রান আউট করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন বাবর আজম। এরপর ৬৭ বলে পঞ্চাশ ছোঁয়ার পর ৫৬ রানে সাজিদ খানকে ফিরতি ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান তিনি। ভাগ্য যখন তাকে শতরানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হাসান আলির শর্ট বলের ফাঁদে পা দিলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই তাকে শর্ট বলে পরীক্ষা করছিলেন হাসান। লিটন কয়েকবার বল ছেড়েছেন, কয়েকবার মাথা নিচু করে ‘ডাক’ও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধৈর্য হারিয়ে থার্ডম্যানে সাউদ শাকিলের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন।
জোড়া শতরান না হলেও একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করার কৃতিত্ব ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো দেখালেন লিটন। বাংলাদেশের হয়ে তামিম ইকবাল ও নাজমুল হোসেন শান্তও এই কীর্তি গড়েছেন তিনবার করে। তবে লিটন অনন্য অন্য এক জায়গায়; তিনি তিনবারই এই কীর্তি গড়েছেন ছয় নম্বর বা তার নিচে ব্যাটিংয়ে নেমে। টেস্ট ইতিহাসে এই পজিশনে নেমে এমন কীর্তি আছে কেবল ইংল্যান্ডের ম্যাট প্রায়র ও শ্রীলঙ্কার ধানাঞ্জায়া ডি সিলভার।
এই ইনিংসের পথে পঞ্চম উইকেটে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ১২৩ রানের একটি চমৎকার জুটিও গড়েন লিটন। পঞ্চম বা তার নিচের উইকেটে এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো শতরানের জুটি বাঁধলেন এই দুই ভরসার প্রতীক। টেস্ট ইতিহাসে তাদের ওপরে আছে কেবল ইংল্যান্ডের জো রুট ও বেন স্টোকস জুটি (৮টি)। পাকিস্তানের বর্তমান ব্যাটিং কোচ আসাদ শফিক ও মিসবাহ-উল-হাকের এমন জুটি আছে ৭টি। তবে রুট-স্টোকস জুটি ৪৭ ইনিংসে এবং শাফিক-মিসবাহ জুটি ৪৩ ইনিংসে এই রেকর্ড গড়েছেন, যেখানে মুশফিক-লিটন জুটির লেগেছে মাত্র ২৫ ইনিংস! সব মিলিয়ে মুশফিক ও লিটনের শতরানের জুটির সংখ্যা এখন ৮টি, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ।