নতুন বল হাতে রান আপ নিচ্ছেন তাইজুল ইসলাম। দৃশ্যটা দেখে গ্যালারি কিংবা টিভি পর্দার অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকে ফেলেছিলেন। অনেকক্ষণ ধরেই এই নতুন বলের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ দল, কিন্তু নতুন বল আসতেই দুই পেসারের বদলে অধিনায়ক এক প্রান্তে আনলেন একজন স্পিনারকে। প্রথম বলেই একটি আলগা ফুল টস দিয়ে বাউন্ডারি হজম করলেন তাইজুল। কিন্তু ঠিক সেই ওভারেরই এক দুর্দান্ত ডেলিভারিতে সালমান আলী আগাকে বোল্ড করে দিলেন তিনি। মুহূর্তেই প্রমাণ হয়ে গেল, বাংলাদেশ অধিনায়কের এই ফন্দিটা একদম নিখুঁত ছিল।
বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো এই বড় জুটিটা ভাঙাই শুধু নয়, নিজের পরের ওভারে তাইজুল এনে দিলেন আরও একটি উইকেট। আর তাতেই শেষ বিকেলের মরে আসা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা। পাকিস্তানের জন্য সান্ত্বনা বলতে এতটুকুই—তারা ম্যাচটিকে পঞ্চম দিনে নিয়ে যেতে পেরেছে।
সিলেট টেস্ট জিতে পাকিস্তানকে ধুয়ে মুছে হোয়াইটওয়াশ করার জন্য শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন আর মাত্র ৩ উইকেট। অন্যদিকে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ম্যাচ জিততে হলে সফরকারীদের প্রয়োজন আরও ১২১ রান। ৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান চতুর্থ দিন শেষ করেছে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান তুলে। মোহাম্মদ রিজওয়ান একপ্রান্ত আগলে রেখে অপরাজিত আছেন। এছাড়া অধিনায়ক শান মাসুদ ও সালমান আলী আগা দুজনেই ৭১ রান করে আউট হয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষে একাই ৪ উইকেট শিকার করে ধস নামিয়েছেন তাইজুল ইসলাম।
চতুর্থ দিনে সিলেটের উইকেটটি ব্যাটিংয়ের জন্য দিনজুড়েই দারুণ সহায় ছিল। বলা চলে, পুরো টেস্টের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং উইকেট ছিল আজই। বাংলাদেশ দল আজ বোলিংয়ে ঠিক ততটা আঁটসাঁট বা গোছানো ভাব দেখাতে পারেনি। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুরোটা সময় বুক চিতিয়ে লড়াই করে দিনটি পার করে দেয় পাকিস্তান।
সিলেটের আকাশে আজ সকাল থেকেই ছিল ঝকঝকে রোদ। তাসকিন আহমেদের কিছুটা ধারহীন বোলিংয়ের সুযোগ নিয়ে শুরুতেই দ্রুত কিছু রান তুলে নেয় পাকিস্তান। তবে অন্য প্রান্তে শরিফুল ইসলাম ছিলেন বেশ কিপটে। তাসকিনের জায়গায় নাহিদ রানা আক্রমণে আসতেই রানের গতি কিছুটা কমে আসে এবং প্রথম ব্রেক-থ্রুও এনে দেন তিনিই। তাঁর এক বাড়তি লাফানো বলে গালিতে মেহেদী হাসান মিরাজের চমৎকার ক্যাচে পরিণত হন আব্দুল্লাহ ফাজাল (৬)। এরপর মিরাজ বল হাতেও দলকে দ্রুত সাফল্য এনে দেন। তাঁর এক স্কিড করা আর্ম বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন আজান আওয়াইস (২১)।
এরপর বাবর আজম ক্রিজে গিয়েই নাহিদ রানার ১৪৭.৭ কিলোমিটার গতির ডেলিভারিতে দারুণ এক আপার কাটে চার মেরে নিজের খাতা খোলেন। বাবর ও শান মাসুদের ব্যাটে এরপর রান আসতে থাকে টি-টোয়েন্টি স্টাইলে। মাত্র ৫১ বলেই এই দুজন স্কোরবোর্ডে ৫০ রান যোগ করেন। বাংলাদেশের বোলাররা কোনোভাবেই এই রানের গতিতে বাঁধ দিতে পারছিলেন না। প্রথম সেশনেই ১ উইকেট হারিয়ে ১০১ রান তোলে পাকিস্তান।
লাঞ্চের পর প্রথম বলেই ছক্কা মেরে নিজের মানসিকতা বুঝিয়ে দেন বাবর আজম। বেশ নির্বিঘ্নেই এগিয়ে যাচ্ছিল এই জুটি। কিন্তু তাইজুল ইসলামের এক অতি সাধারণ ও নিরীহ ডেলিভারিতে হুট করেই ভেঙে যায় ৯২ রানের এই জুটি। লেগ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে বাবর (৪৭) উইকেটের পেছনে লিটন দাসের এক অসাধারণ ক্যাচে পরিণত হন।
পরের দুটি উইকেটের জন্য বাংলাদেশকে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। নাহিদ রানার ফুল লেংথ বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে লিটনের হাতেই ধরা পড়েন সাউদ শাকিল (৬)। আর দারুণ খেলতে থাকা অধিনায়ক শান মাসুদ ৭১ রানে থামেন তাইজুলের বলে। শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে মাহমুদুল হাসান জয় চোখধাঁধানো এক রিফ্লেক্স ক্যাচে মাসুদকে বিদায় করেন।
১6৪ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল আজই হয়তো ম্যাচের এপিটাফ লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু সালমান ও রিজওয়ানের মনে ছিল অন্য পরিকল্পনা। বাংলাদেশের সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এক বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এই দুজন। এই সময়ে তাঁদের চাপে ফেলার মতো ধারাবাহিক ও নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে পারেনি বাংলাদেশ। ৮৬ বলে ফিফটি করেন রিজওয়ান এবং ৭৪ বলে সালমান। বাংলাদেশ দল একপর্যায়ে নতুন বলের আশায় স্রেফ ওভার পার করতে থাকে। অন্যপ্রান্তে রিজওয়ান ও সালমানও নানাভাবে সময় নষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সময় ক্ষেপণ নিয়ে রিজওয়ানের সঙ্গে মাঠে বেশ এক চোট লেগে যায় উইকেটকিপার লিটনের।
তবে শেষ পর্যন্ত নতুন বলেই ভাঙন ধরে ১৩৪ রানের এই জুটিতে। তাইজুলের একটি বল টার্ন করে বাইরে চলে যাওয়ার পর, পরের বলটিও টার্নের জন্য খেলেছিলেন সালমান। কিন্তু বল টার্ন না করে সোজা ঢুকে গিয়ে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে স্টাম্পে আঘাত হানে। নিজের পরের ওভারে এসে তাইজুল এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে বিদায় করেন হাসান আলীকেও। শেষ পর্যন্ত সাজিদ আলীকে নিয়ে দিনের বাকি সময়টুকু কোনোমতে পার করেন রিজওয়ান। তবে শেষ বিকেলের ওই দুটি উইকেট বাংলাদেশকে জয়ের একদম দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
- বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৭৮
- পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ২৩২
- বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৯০
- পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ৮৬ ওভারে ৩১৬/৭ (মাসুদ ৭১, সালমান ৭১, বাবর ৪৭, রিজওয়ান অপরাজিত; তাইজুল ৪/১১৩, নাহিদ ২/৫৮, মিরাজ ১/৬২)