আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নীল সমুদ্রের গর্জন আর ব্যাটে-বলে ভারতীয় বীরদের তান্ডব—সব মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে আরও একবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সিংহাসনে বসল ভারত। আড়াই বছর আগে এই মাঠেই ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে যে বিষাদের নীল ছায়া নেমেছিল, এবার সেই মাঠেই উৎসবের আবির উড়াল সুরিয়াকুমার ইয়াদাভের দল।
আহমেদাবাদের গ্যালারিতে তখন লাখো দর্শকের উন্মাদনা। সেই জোয়ারে ভেসে মাঝের ২২ গজে রানের সুনামি বইয়ে দিলেন সাঞ্জু স্যামসন, আভিশেক শার্মারা। নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার পাশাপাশি একগুচ্ছ রেকর্ড নিজেদের করে নিল টিম ইন্ডিয়া। প্রথম দেশ হিসেবে টানা দুবার এবং সব মিলিয়ে তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ল তারা। সেই সঙ্গে ঘুচল কিউই-জুজু; বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডকে হারের স্বাদ দিল ভারত।
ব্যাটিং তাণ্ডব ও পাহাড়সম পুঁজি
টসে জিতে আগে ব্যাটিং করতে নেমে শুরু থেকেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন ভারতীয় ব্যাটাররা। পাওয়ার প্লে-তেই স্কোরবোর্ডে জমা হয় ৯২ রান! আভিশেক শার্মা মাত্র ১৮ বলে ফিফটি করে আসরের দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ড গড়েন। এরপর সাঞ্জু স্যামসনের ব্যাট হয়ে ওঠে তলোয়ার। মাত্র ৪৬ বলে ৮ ছক্কায় ৮৯ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। মাঝপথে ইশান কিষানের ২৫ বলে ৫৪ আর শেষ দিকে শিভাম দুবের ঝোড়ো ক্যামিওতে ভারত পায় ২৫৫ রানের বিশাল পুঁজি, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বুমরাহ’র বোলিং মাস্টারক্লাস
২৫৬ রানের পাহাড় টপকাতে নেমে শুরুতেই জাসপ্রিত বুমরাহ’র তোপে পড়ে নিউজিল্যান্ড। নিজের প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে কিউইদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন এই পেসার। ৪ ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়ে বুমরাহ প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান বিশ্বের সেরা বোলার বলা হয়। টিম সাইফার্ট (৫২) এবং মিচেল স্যান্টনার (৪৩) কিছুটা লড়াই করলেও ভারতের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে এক ওভার বাকি থাকতেই ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড।
অর্জনের খাতায় যা কিছু যোগ হলো:
- প্রথম স্বাগতিক চ্যাম্পিয়ন: নিজেদের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা প্রথম দল এখন ভারত।
- টানা দুই শিরোপা: প্রথম দল হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মুকুট ধরে রাখল তারা।
- সাঞ্জুর দাপট: পুরো আসরে দুর্দান্ত খেলে টুর্নামেন্ট সেরা (Man of the Tournament) হয়েছেন সাঞ্জু স্যামসন।
- বুমরাহ’র রেকর্ড: ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় হয়ে বুমরাহ গড়লেন পেসার হিসেবে ফাইনালে ৪ উইকেট নেওয়ার অনন্য রেকর্ড।
ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে যখন ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বাজছিল, তখন ভিআইপি বক্সে ভারতের দুই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শার্মার আলিঙ্গন যেন পূর্ণতা দিচ্ছিল এই মহাকাব্যিক জয়কে। বিষাদের আহমেদাবাদ এবার হয়ে রইল ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
- ভারত: ২০ ওভারে ২৫৫/৫ (স্যামসন ৮৯, আভিশেক ৫২, কিষান ৫৪, পান্ডিয়া ১৮, সুরিয়াকুমার ০, তিলাক ৮*, দুবে ২৬*; হেনরি ৪-০-৪৯-০, ফিলিপস ১-০-৫-০, ডাফি ৩-০-৪২-০, ফার্গুসন ২-০-৪৮-০, স্যান্টনার ৪-০-৩৩-০, রাভিন্দ্রা ২-০-৩২-১, নিশাম ৪-০-৪৬-৩)।
- নিউ জিল্যান্ড: ১৯ ওভারে ১৫৯ (সাইফার্ট ৫২, অ্যালেন ৯, রাভিন্দ্রা ১, ফিলিপস ৫, চ্যাপম্যান ৩, মিচেল ১৭, স্যান্টনার ৪৩, নিশাম ৮, হেনরি ০, ফার্গুসন ৬*, ডাফি ৩; আর্শদিপ ৪-০-৩২-০, পান্ডিয়া ৪-০-৩৬-১, আকসার ৩-০-২৭-৩, বুমরাহ ৪-০-১৫-৪, ভারুন ৩-০-৩৯-১, আভিশেক ১-০-৫-১)।
ফল: ভারত ৯৬ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: জাসপ্রিত বুমরাহ
ম্যান অব দা সিরিজ: সাঞ্জু স্যামসন