পাকিস্তানের বিপক্ষে গতকাল সিলেটে এক ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের রূপকথা লিখেছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের পর দ্বিতীয় কোনো দল হিসেবে এবার পাকিস্তানকে টানা চার টেস্টে হারানোর অনন্য কীর্তি গড়ল টাইগাররা। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম টানা চার ম্যাচ জয়ের মধুর স্বাদও পেল বাংলাদেশ দল।
দুই ম্যাচের এই সিরিজে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের দুই স্পিনার তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের। বিশেষ করে দ্বিতীয় টেস্টে বল হাতে একাই ম্যাজিক দেখিয়েছেন তাইজুল। প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে একাই ধসিয়ে দেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ, তুলে নেন ৬ উইকেট। অন্য প্রান্তে মিরাজও দুই ইনিংস মিলিয়ে শিকার করেন ৩ উইকেট।
শিষ্যদের এমন অতিমানবীয় অর্জনে একজন কোচ হিসেবে যারপরনাই আনন্দিত বাংলাদেশের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে এক চরম সত্য হলো—নিজের প্রিয় জন্মভূমির এমন যাচ্ছেতাই পরাজয়ে বুকটা ভেঙে গেছে তাঁর। গতকাল পাকিস্তানের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ‘এআরওয়াই স্পোর্টস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সাবেক এই কিংবদন্তি লেগ স্পিনার অকপটে স্বীকার করেন, এটি এমন এক অনুভূতি যা চাইলেও মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। নিজের দেশের এই হারে মুশতাকের মন এতটাই খারাপ ছিল যে, সিলেট টেস্ট জেতার পর বাংলাদেশ দলের ঐতিহ্যবাহী গ্রুপ ছবি তুলতেও মাঠে নামেননি তিনি।
পাকিস্তানের এই সিরিজ হারে নিজের খারাপ লাগার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুশতাক বলেন:
“অবশ্যই মনের ভেতর একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। একজন পেশাদার কোচ হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো যা জানি, তা ছেলেদের উজাড় করে শেখানো। কিন্তু সত্যি বলতে, কাল পাকিস্তানের এই হারের পর আমি ভীষণ বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। দেখুন, বাংলাদেশ দুই টেস্টেই জিতেছে, তার মানে আমি আমার কাজের সুফল পাচ্ছি, আল্লাহ আমাকে পুরস্কৃত করছেন। কিন্তু পাকিস্তান দল তো আমার নিজের দল, যে দলের হয়ে খেলার সুনামের কারণেই আজ বাংলাদেশ আমাকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তাই নিজের দেশের এই দশা দেখে মনটা আসলেই খারাপ ছিল। আমি তো ম্যাচ শেষে ছেলেদের সাথে গ্রুপ ছবি তোলার জন্য নিচে মাঠের দিকেও যাইনি।”
সদ্য সমাপ্ত এই সিরিজে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঠের পারফরম্যান্সের আসল পার্থক্যটা কোথায় ছিল, তা তুলে ধরে মুশতাক আরও যোগ করেন:
“বাংলাদেশ এই সিরিজে দুর্দান্ত এবং স্মার্ট ক্রিকেট খেলেছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো, আমরা (বাংলাদেশ) পাঁচজন মূল বোলার নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম, যা দল হিসেবে অনেক বড় একটা বার্তা দেয়। টেস্ট ক্রিকেটে আপনি বোর্ডে ৬০০ রান তুললেও ম্যাচ জিততে হলে আপনাকে প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট নিতেই হবে। কন্ডিশন বিবেচনায় এটি অত্যন্ত সাহসী একটি সিদ্ধান্ত ছিল।”
সবুজ উইকেটেও স্পিনারদের দারুণ ব্যবহারের কৌশল ব্যাখ্যা করে ৯২-এর বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা বলেন:
“ঘাসের উইকেটেও আপনাকে দুজন স্পিনার খেলানোর সাহস রাখতে হবে। আমি রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের সময়ই বলেছিলাম, এশিয়ান কন্ডিশনে উইকেটের ওপরে ঘাস থাকলেও কড়া রোদের কারণে ভেতরে কিন্তু মাটি শুষ্কই থাকে। প্রথম এক-দুই দিন হয়তো পেসাররা কিছুটা মুভমেন্ট আর গতি পাবে, কিন্তু ভেতরের অংশ শুষ্ক থাকায় সময়ের সাথে সাথে স্পিনারদের ভূমিকা আরও কার্যকরী হয়ে ওঠে।”
দুই দলের একাদশ নির্বাচনও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে বলে মনে করেন মুশতাক:
“বাংলাদেশ দলের কম্বিনেশনটা খুব চমৎকার ছিল। ৫ বোলারের সাথে ৬ জন খাঁটি ব্যাটসম্যান খেলানো হয়েছে, যার মধ্যে ৬ নম্বর ব্যাটসম্যান (লিটন) আবার উইকেটকিপারও। দেখুন, আমাদের (বাংলাদেশ) প্রথম ইনিংসে ১৫০ রানের মধ্যে ৬ জন আউট হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের যদি একজন অতিরিক্ত বা পঞ্চম বোলার থাকত, তবে আমাদের জন্য ২০০ রান করাও কঠিন হয়ে যেত। কারণ, সেই বোলারটি এসে বাকি পেসারদের বিশ্রাম দিতে পারত। আমি আমাদের ব্যাটসম্যানদের বলেছিলাম, আমাদের শুধু একটা বড় জুটি দরকার, তাহলে দ্বিতীয় ইনিংসে ওরা আমাদের আর ছুঁতে পারবে না। টেস্ট ক্রিকেটে কৌশলগত এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়।”