শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মিন্টু আবাসিক এলাকা থেকে যখন যাত্রা শুরু করলাম, লক্ষ্য একটাই—পশ্চিম সিডনির স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়াম। ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় লাগল পৌঁছাতে, মাঝে একবার ট্রেনও বদলাতে হলো। প্যারামাট্টা স্টেশনে নেমে মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ। দূর থেকেই চোখে পড়ল সেই বিশাল কাঠামো। দাপ্তরিক নাম ‘ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়াম’ হলেও ফুটবলপ্রেমী আর স্থানীয়দের কাছে এটি স্পনসরের নামানুসারে ‘কমব্যাংক স্টেডিয়াম’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।
গতকাল দুপুরে যখন স্টেডিয়াম চত্বরে পা রাখলাম, আকাশটা ছিল কিছুটা মেঘলা। সিডনির আবহাওয়া ঠিক ব্রিটিশ মেজাজের—এই রোদ তো এই ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এই মাঠেই আগামী ৩ মার্চ এশিয়ান কাপের ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের মুখোমুখি হবে আমাদের বাংলাদেশ। এর তিন দিন পর, ৬ মার্চ লড়াই উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত আসরে বাংলাদেশের প্রথম দুটি রোমাঞ্চকর ম্যাচের সাক্ষী হতে যাচ্ছে এই আধুনিক ভেন্যুটি।
ছিমছাম আয়োজন ও নিখুঁত প্রস্তুতি
অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের স্টেডিয়ামগুলো সবসময়ই যেন বধূবরণের সাজে প্রস্তুত থাকে। ১২টি দল নিয়ে এবারের আসর বসছে সিডনি, পার্থ এবং গোল্ডকোস্টে। পাঁচটি ভেন্যুর অন্যতম এই কমব্যাংক স্টেডিয়ামে ঢুকে কিছুটা অবাকই হলাম। কোনো হইচই নেই, বাড়তি ধোয়ামোছার ধুম নেই। পুরো স্টেডিয়াম ঘুরে ১০ জন মানুষের দেখাও মেলা ভার। শুধু কয়েকজন কর্মী একমনে সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দিচ্ছিলেন। পরিবেশটা এতই শান্ত যে বোঝাই দায়, কাল এখানে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে মাঠের ভেতর উঁকি দিতেই দেখা গেল আসল দৃশ্য। সবুজ ঘাস কাটার যন্ত্রটা পুরো মাঠ ঘুরছে। মাঠটা যেন একদম নিখুঁত এক সবুজ গালিচা। এত মসৃণ আর ঝকঝকে যে, সাবিনা-মারিয়াদের কাছে এটি স্বপ্নের এক মঞ্চ হতে বাধ্য। স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় এক নারী স্বেচ্ছাসেবীর সাথে দেখা। হাসিমুখে তিনি বললেন, “আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ, এখন শুধু বল মাঠে গড়ানোর অপেক্ষা।”
ঐতিহ্যের ওপর আধুনিকতার ছোঁয়া
এই স্টেডিয়ামটি নির্মিত হয়েছে পুরনো পারামাটা স্টেডিয়ামের জায়গায়। ২০১৯ সালে উদ্বোধন হওয়া এই মাঠ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা, করপোরেট স্যুট আর মিডিয়া সেন্টার—সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ভেন্যু।
স্টেডিয়ামের ঠিক সামনেই চোখে পড়ল এক শান্ত ক্রিকেট মাঠ, যা গাছে গাছে ঘেরা। সেখানে পাখির কিচিরমিচির আর বাদুড়ের মেলা দেখে মনে হলো, ক্লান্ত যে কেউ এখানে এসে প্রশান্তি পাবেন। মাঠের পাশে ছোট প্যাভিলিয়নে লেখা ‘প্যারামাট্টা ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট ক্লাব’।
মাঠের বাইরের আবহ
সিডনি আর প্যারামাট্টার এই জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের আড়ালে মারিয়া-ঋতুপর্ণারা নীরবে ঘাম ঝরিয়েছেন তাদের টিম হোটেলের কাছের মাঠে। অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার ফোনে জানালেন, তারা এখনো মূল স্টেডিয়াম দেখার সুযোগ পাননি। দলে ছোটখাটো চোট থাকলেও বড় কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
দুর্ভাগ্যবশত, সিডনিতে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে এখনো ফুটবল আমেজ সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। অনেকেই জানেন না যে ১৯৮০ সালের পর বাংলাদেশ আবার এশিয়ার সর্বোচ্চ আসরে খেলছে। তবে সব স্তব্ধতা ভেঙে যাবে আগামী ৩ মার্চ। যখন গ্যালারিতে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে গর্জে উঠবে এক দল মানুষ—“বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!”