“ইনি কি আসলেই লিটন, নাকি অন্য কেউ?”—দৃশ্যটা দেখে এমন ধন্দে পড়তে পারতেন যে কেউ। চোখ কচলে বারবার দেখলেও অবশ্য বাস্তবতার কোনো হেরফের হয়নি। সিলেটের সবুজ মাঠে সত্যিই যেন ডানা মেলে দিয়েছিলেন লিটন কুমার দাস। পাকিস্তানের গতি তারকা শোয়েব আখতারের সেই বিখ্যাত উদযাপনের মতোই দুই হাত ছড়িয়ে উড়ছিলেন বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার। এমনিতে মাঠে এমন বাঁধনহারা উদযাপন লিটনের খুব একটা দেখাই যায় না। তবে বাবর আজমের সেই অবিশ্বাস্য ক্যাচটি নেওয়ার পর নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেননি তিনি।
বাবর আজম তখন দারুণ খেলছিলেন, বাংলাদেশের জন্য তাঁর উইকেটটি পাওয়া ছিল ভীষণ জরুরি। লিটনের এমন বুনো উল্লাসের পেছনে সেটি তো একটা বড় কারণ বটেই, তবে আরও একটা বড় কারণ লুকিয়ে ছিল ক্যাচটির ধরনের মধ্যে। তাইজুল ইসলামের বলটি ছিল একদমই নিরীহ, লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যাওয়া অতি সাধারণ এক ডেলিভারি। সেটিতে স্রেফ আলতো করে ব্যাট ছুঁইয়ে দিয়েছিলেন বাবর। কিন্তু উইকেটের পেছনে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে অসাধারণ দক্ষতায় বলটি নিজের গ্লাভসে জমান লিটন। যেকোনো মানদণ্ডেই এটি একটি বিশ্বমানের ক্যাচ, যা পৃথিবীর যেকোনো উইকেটকিপারকে এক গণ্ডুষ পরম তৃপ্তি দেবে।
সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিনে নেওয়া এই ক্যাচটি আসলে লিটনের সামর্থ্যের একটা ছোট নমুনা মাত্র। দুর্দান্ত সব ক্যাচ নেওয়াকে এখন রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করেছেন তিনি। শুধু চোখধাঁধানো ক্যাচ বা স্টাম্পিং করাই নয়, গত দেড়-দুই বছর ধরে ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই অসাধারণ কিপিং করে চলেছেন এই ডানহাতি ক্রিকেটার।
উড়ন্ত ক্যাচ বা বিদ্যুৎগতির স্টাম্পিংগুলো সাধারণ দর্শকের চোখে পড়ে বেশি। কিন্তু একজন কিপারের আসল পরীক্ষা চলে ম্যাচজুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিখুঁত কিপিং করে যাওয়া, যা লিটন নিয়মিত করে চলেছেন। আজ সকালের সেশনেই যেমন তাসকিন আহমেদের একটি ডেলিভারি লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে দিয়ে সীমানার দিকে যাচ্ছিল। লিটন পুরো শরীর শূন্যে ভাসিয়ে দারুণ ক্ষিপ্রতায় তা গ্লাভসবন্দি করে নিশ্চিত চারটি রান বাঁচিয়ে দেন।
এই ধরনের ‘সেভ’ এখন তিনি প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই করছেন। এমনিতে এগুলো একজন কিপারের নিয়মিত কাজের অংশ এবং দলের বাকিরাও আশা করে কিপার তাঁর কাজটা ঠিকঠাক করবেন। তবে লিটন এই সাধারণ কাজগুলোকেই এতটাই নিখুঁত ও সহজভাবে করছেন যে নিজেকে প্রতি ম্যাচেই এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। কিপারদের ম্যাচ চলাকালীন ছোটখাটো ভুল হতেই পারে, লিটনেরও হয়; তবে ইদানীং তাঁর ভুলের গ্রাফটা নেমে এসেছে একদম শূন্যের কাছাকাছি।
কিপার হিসেবে বলের লাইন বোঝা বা অ্যান্টিসিপেশন, দুর্দান্ত রিফ্লেক্স, নিখুঁত ফুটওয়ার্ক, ডাইভিং ও ফিল্ডিং সাজানোয় বোলারদের সাহায্য করা—সবখানেই লিটন অনন্য। এমনকি ম্যাচের পরিস্থিতি ও ব্যাটসম্যানের মানসিকতা বুঝে উইকেটের পেছন থেকে বোলারকে বুদ্ধি দেওয়া কিংবা অধিনায়ককে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও তিনি দারুণ ভূমিকা রাখছেন।
তাঁর ব্যাটিংয়ের মতোই কিপিংয়ের ধরনটাও বেশ স্টাইলিশ ও মসৃণ। বাবর আজমের ওই ক্যাচটির মতো অনেক কঠিন কাজকে তিনি এত সহজে ফুটিয়ে তোলেন যে অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না কাজটি আসলে কতটা কঠিন ছিল। যেভাবে তিনি দিনের পর দিন গ্লাভস হাতে অবদান রাখছেন, তাতে এখন ক্রিকেট মহলে একটা প্রশ্ন জোরেশোরেই উঠছে—লিটনই কি এখন বিশ্বের সেরা উইকেটকিপার?
বর্তমানে ক্রিকেটের তিন সংস্করণে নিয়মিত দাপটের সাথে কিপিং ও ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়া ক্রিকেটারের সংখ্যা বড্ড বিরল। সেই জায়গায় লিটন অনেক কিপারের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নিঃসন্দেহে অস্ট্রেলিয়ার অ্যালেক্স কেয়ারি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাদা পোশাকে কেয়ারি হয়তো কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারেন, তবে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে লিটনের চেয়ে ভালো কিপার-ব্যাটসম্যান এই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিন সংস্করণ মিলিয়ে যদি তাঁকে বর্তমান বিশ্বের সেরা কিপার বলে দেওয়া হয়, তবে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের অনেকেই হয়তো তাতে একবাক্যে সায় দেবেন।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বোলিং কোচ শন টেইটও জানালেন, দুর্দান্ত কিপিংয়ের জন্য ড্রেসিংরুমে লিটনকে আলাদাভাবে বাহবা দেওয়া হয়েছে, “উইকেটের পেছনে ও কতটা পরিপাটি, তা আপনারা সবাই দেখছেন। বিশেষ করে গত এক মাস ধরে ও অসাধারণ খেলছে। ড্রেসিংরুমে আমরা ওর কিপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসাও করেছি, কারণ একজন ভালো কিপার ম্যাচে কতটা বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। লিটনের কিপিং এই মুহূর্তে সত্যি খাঁটি বিশ্বমানের।”
কোচ যখন ‘বিশ্বমানের’ শব্দটা উচ্চারণ করলেন, তখন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলো—তাহলে বর্তমান বিশ্বের অন্য কিপারদের তুলনায় লিটনের অবস্থান ঠিক কোথায়? বোলিং কোচ প্রথমে একটু রসিকতা করলেন, পরে লিটনের বর্তমান ফর্ম নিয়ে কথা বললেন।
টেইট বলেন, “এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খুব বেশি হচ্ছে না, শুধু আইপিএল চলছে। তাই এই মুহূর্তে লিটনই বিশ্বের সেরা, কারণ মাঠে ওর মতো পারফর্ম করার মতো আর কেউ এখন নেই। তবে সাধারণ বিবেচনাতেও ওকে বর্তমান বিশ্বের একদম শীর্ষ সারিতেই রাখতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কিপিংয়ের পাশাপাশি ও যেভাবে ব্যাটিং করছে, তা এককথায় দুর্দান্ত। একজন অলরাউন্ড ক্রিকেটার হিসেবে এই মুহূর্তে লিটন সম্ভবত তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সোনালী ফর্ম উপভোগ করছে।”