প্রায় এক দশক ধরে ভারতীয় দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর এলো অধিনায়কত্ব ছাড়ার সেই কঠিন অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়টা এবং নেতৃত্ব পরবর্তী দিনগুলো নিয়ে এবার একেবারে মন খুলে কথা বললেন ভিরাট কোহলি।
ভারতের ইতিহাসের সফলতম এই টেস্ট অধিনায়ক অকপটে স্বীকার করলেন, অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর ক্রিকেট খেলার আসল আনন্দটাই তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর সেই অন্ধকার সময়ে তাকে টেনে তুলেছেন সাবেক প্রধান কোচ রাহুল দ্রাবিড় ও ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কোহলি বলেন, তারা স্রেফ কোচ ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানসিকভাবে তার অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।
অধিনায়কত্বের শেষ আর ফর্মের টানাপোড়েন
ব্যাট হাতে কোহলি নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায়। কিন্তু নেতৃত্বের শেষ দিকটা তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া, ওয়ানডের অধিনায়কত্ব হারানো—সব মিলিয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে টেস্টের অধিনায়কের পদ থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় খরা। টানা তিন বছর টেস্টে কোনো সেঞ্চুরি পাননি।
২০২৩ সালে অবশ্য চেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করেন কোহলি। পুরোপুরি সেই আগের (২০১৬-২০ ২০১৯) অতিমানবীয় ফর্মে না ফিরলেও, ২০২৩ সালে টেস্টে প্রায় সাড়ে ৫৪ গড়ে দুটি সেঞ্চুরি করেন। আর বছরের শেষ দিকে ওয়ানডে বিশ্বকাপে তো রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন।
“মনে হতো, আমি যেন তাদের জন্যই খেলছি”
সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে ‘আরসিবি ইনোভেশন ল্যাব ইন্ডিয়ান স্পোর্টস সামিট’-এ এসে সেই কঠিন দিনগুলোর কথা মনে করেন কোহলি। দ্রাবিড় ও রাঠোরের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন:
“রাহুল ভাই আর বিক্রম রাঠোরের কথা আমি বারবার বলি। যখনই ওদের সাথে দেখা হয়, আমি মন থেকে ধন্যবাদ জানাই। ওনারা যেভাবে আমার যত্ন নিয়েছিলেন, একটা সময় মনে হতো আমি যেন ওনাদের জন্যই মাঠে খেলছি। ওনারা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন যে আমি ক্রিকেটকে কী দিয়েছি, যা একজন খেলোয়াড় নিজে নিজে কখনো বসে ভাবে না।”
মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ‘ইম্পোস্টার সিনড্রোম’
বাইরে থেকে কোহলিকে যতই ইস্পাতকঠিন মনে হোক না কেন, তিনিও যে একজন মানুষ, তা মনে করিয়ে দিলেন ক্যারিয়ারে ‘ইম্পোস্টার সিনড্রোম’-এর সাথে লড়াইয়ের কথা বলে। (সহজ কথায়, ইম্পোস্টার সিনড্রোম হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে সফল হওয়ার পরও মানুষ নিজের যোগ্যতা নিয়ে নিজেই সংশয়ে ভোগে এবং সবসময় একটা ভয়ে থাকে যে এই বুঝি তার আসল রূপ বা ব্যর্থতা সবার সামনে প্রকাশ পেয়ে গেল)।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় দুই দশক কাটানোর পরও এই নিরাপত্তাহীনতা এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ৩৭ বছর বয়সী কোহলি হাসতে হাসতেই বললেন:
“আজকেও যখন নেটে ব্যাটিং করতে যাই, মনে হয় এই তরুণেরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা সেশন যদি খারাপ যায়, মনের ভেতর খটকা লাগে—ওরা কি ভাবছে, ‘এই লোকটাই ২০ বছর ধরে খেলছে?’ এই দ্বিধাটা সবসময় থাকে। রাহুল ভাই নিজে সর্বোচ্চ স্তরে খেলেছেন বলে আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছিলেন। বিক্রম ভাইও বুঝতেন। ওনারা আমার মানসিক যত্ন নিয়েছিলেন বলেই আমি আবার ক্রিকেটকে ভালোবাসতে পেরেছি।”
৯ বছর কেউ জিজ্ঞেস করেনি, “কেমন আছো?”
একটানা তিন সংস্করণে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার চাপ যে কতটা ভয়ংকর, সেটাও তুলে ধরলেন কোহলি। তিনি জানান, অধিনায়ক থাকলে সারাক্ষণ শুধু দলের কথাই ভাবতে হয়, নিজের দিকে তাকানোর ফুসরত থাকে না।
“পেছনে ফিরে তাকালে অবাক লাগে, প্রায় ৯ বছর ধরে একটা মানুষও আমাকে এসে জিজ্ঞেস করেনি—’ভিরাট, তুমি কেমন আছো?’ তখন অবশ্য নিজেরও এই চিন্তা মাথায় আসত না। তবে আমার কোনো আফসোস নেই। সুযোগ পেলে আমি আবারও একইভাবে দেশের জন্য নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিতাম।”
টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ইতিমধ্যে বিদায় জানানো কোহলি এখন খেলছেন শুধু ওয়ানডে ফরম্যাটে। তবে কোহলির এই অকপটে মনের কথা বলে দেওয়া মনে করিয়ে দেয়, ২২ গজের ভেতরের চাকচিক্যের আড়ালেও ক্রিকেটারদের কত বড় মানসিক লড়াই লড়তে হয়।